রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১০:০৬ অপরাহ্ন

সৌদি আরবে বাংলাদেশ বিমানের সব ফ্লাইটে নিষেধাজ্ঞা

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২২, ৬:১১ পূর্বাহ্ন

আগের দিন সন্ধ্যায় সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (জিএসিএ) জানায় পরদিন ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কোনো ফ্লাইট নামবে না। এ বার্তা পেয়ে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয় রিয়াদে বিমানের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক আল মামুন ফারুকের।

 

তিনি হন্তদন্ত হয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে রাষ্ট্রদূত জাবেদ পাটোয়ারীকে জানান, সৌদি সরকার দেশটিতে বিমানের কার্যক্রম বাতিল করেছে। রাষ্ট্রদূত ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ করে সময়সীমা এক সপ্তাহ বাড়িয়ে নেন। সেই হিসেবে গত সোমবার সময়সীমা পার হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার থেকে বিমানের কোনো ফ্লাইট সৌদি আরবের উদ্দেশে ওড়ার কথা ছিল না।

 

কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব টের পেয়ে রাষ্ট্রদূত বিষয়টি বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীকে লিখিতভাবে জানান। বিমান প্রতিমন্ত্রী দেশে বসে কলকাঠি নেড়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও সৌদি আলটিমেটামের খড়গ ঝুলছেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে দেশটিতে বিমানের অপারেশন বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না বলে দেশটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

 

আপাতত রক্ষা পেলেও জাবেদ পাটোয়ারীর চিঠিতে সৌদি আরবে বিমানের চরম অব্যবস্থাপনা ফুটে উঠেছে। সৌদি সিভিল এভিয়েশনের নিয়ম হচ্ছে একটি এয়ারলাইনস দেশটিতে একটি জিএসএ বা জেনারেল সেলস এজেন্ট নিয়োগ দিতে পারবে। যেখানে বিমানের ছিল দুটি। একটি ইস্টার্ন রিজিওনের জন্য এসিই, অপরটি ওয়েস্টার্ন রিজিওনের জন্য ইএলএএফ। সৌদি সিভিল এভিয়েশন বারবার এ বিষয়ে নোটিস করেছে।

 

কিন্তু তাতে যথাযথ সাড়া দেয়নি বিমান ব্যবস্থাপনা। এই অবস্থায় গত বছরের সেপ্টেম্বরেই বিমানের অপারেশন বাতিল করেছিল সৌদি সিভিল এভিয়েশন। ওই সময় দেনদরবারের পর তারা অক্টোবর মাস পর্যন্ত সময় বাড়ায়। কিন্তু এক মাসে সমাধান হবে না বুঝতে পেরে জাবেদ পাটোয়ারী সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নেন। বিমান এই সময়ের মধ্যে একটি জিএসএতে ফিরে এলেও আগের জিএসএর সঙ্গে লেনদেন মেটাতে ব্যর্থ হয়। পুরাতন জিএসএর দাবি, নিরাপত্তা অর্থ বাবদ তারা বিমানের কাছে ৬ লাখ সৌদি রিয়াল পাবে। আর বিমানের দাবি, এর পরিমাণ ৩০ লাখ।

 

বিষয়টি এক দিনে সমাধান হবে না। দুই পক্ষের সমঝোতা না হলে বিষয়টি গড়াবে সালিশিতে। এই অবস্থায় বিমান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো অনাপত্তিপত্র (এনওসি) জমা দিতে পারবে না। বিষয়টি অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত চলতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। গত জানুয়ারি থেকে বিমান একক জিএসএ নিয়োগ দিয়েছে। এদিকে নতুন জিএসএর কর্মকর্তারা বিমানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সহাযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

তারা এখনো দাম্মাম এবং রিয়াদে অফিস নেয়নি। অপরদিকে আগের জিএসই এসব স্টেশনে তাদের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফোনসহ অফিস ছেড়ে দিতে বলছে। সবচেয়ে ঝামেলার বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় কর্মীদের ইকামা বদল করেনি দুই সংস্থা। এতে বিমানের এই স্থানীয় কর্মীরা বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত বিমানের অডিট চলার কথা। যেখানে বিমান কর্মকর্তাদের বসার জায়গা নেই, সেখানে অডিট হবে কীভাবে জানিয়েছেন বিমান কর্মকর্তারা।

 

জিএসিএর প্রয়োজন, সমস্যা সমাধান করার জন্য বিমান কী করেছে, দূতাবাসের কর্মকর্তারা কোন পর্যায়ে আছে এবং কী করতে হবে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য গত ৭ ফেব্রুয়ারি আঞ্চলিক ব্যবস্থাপককে নিজের অফিসে ডেকে পাঠান জাবেদ পাটোয়ারী। তার কাছ থেকে শুনে পুরো বিষয়টি প্রতিমন্ত্রীকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। রাষ্ট্রদূত প্রতিমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে বিষয়টিকে আতঙ্কজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্রতিমন্ত্রীকে জানান, ‘সব কিছু শুনে আমি বুঝতে পারলাম এটা দীর্ঘদিনের পুরাতন ইস্যু, প্রতিবারই আমরা সমস্যার সমাধানের জন্য সময় নিই এবং অপ্রত্যাশিতভাবে আমরা আমাদের প্রতিজ্ঞা রাখতে পারি না।

 

পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, দূতাবাসের এখানে কিছু করার সুযোগ নেই। বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বিমান এমন সময় দূতাবাসের কাছে যায় যখন দূতাবাসের কিছু করার থাকে না। বিমান জানে একটা জিএসএ থেকে অন্য জিএসএতে যেতে সমস্যা হয়। এই স্থানান্তর করার সময় সুপরিকল্পনা করা দরকার ছিল।’ এটা না করায় বিদেশের মাটিতে বিমানের কর্মীরা একটা বাজে পরিস্থিতিতে পড়েছেন বলে মনে করেন রাষ্ট্রদূত। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রাষ্ট্রদূত বিমানের সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিমানের বিষয় দেখভাল করার জন্য তিনি দূতাবাসের সিনিয়র কর্মকর্তা মিনিস্টার কাউন্সেলরকে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

 

তিনি এম্বাসির হাই অফিশিয়াল, কনস্যুলেটের কর্মকর্তা ও রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মাম বিমান কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলেছিলেন। সেখানে বিমানের এমডি এবং জিএম মার্কেটিংকে রেখেছিলেন। সবাই যেন একসঙ্গে থেকে যেকোনো সমস্যার সুন্দর সমাধান করতে পারেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাড়া পাননি। হোয়াটসঅ্যাপের বিষয়টিও প্রতিমন্ত্রীকে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। তিনি প্রতিমন্ত্রীকে যে চিঠি লিখেছেন তার কপি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব এবং বিমানের এমডিকেও দিয়েছেন।

 

বিমানের বিষয়টি কীভাবে সমাধান হয়েছে জানতে চাইলে কোনো কর্মকর্তা মুখ খোলেননি। একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কোনো রকমে সামাল দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার যেসব ফ্লাইট যাওয়ার কথা সবগুলোই গেছে। এ বিষয়ে কোনো অনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে দরকার হলে তিনি বিমানের জিএম (পিআর) তাহেরা খন্দকারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

 

কিন্তু বারবার ফোন দেওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থার পিআরের দায়িত্বে থাকা এ কর্মকর্তা ফোন ধরেননি। শেষ পর্যন্ত তাকে বার্তা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘সৌদি আরবে বিমানের ফ্লাইট চলাচল নিয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চাই। সম্ভব হলে ফোনটা রিসিভ করবেন।’ তারপরও সাড়া দেননি তিনি। ঢাকার বাইরে থাকায় বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে।


More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
error:
error: