রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৯:২৬ অপরাহ্ন

ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের চোখে ৮ বছর ধরে দেখছেন রেশমা

প্রকাশিতঃ সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২২, ৫:৩৪ অপরাহ্ন

আজ অম’র একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলা ভাষা-ভাষী সকলের জন্য গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আ’ন্দোলনের সৈনিক আব্দুল মতিনের ভূমিকার কথা সবারই জানা। আজ ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন না থাকলেও তার চোখে পৃথিবীর আলো দেখছেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজে’লার গৃহবধূ রেশমা নাসরীন (৪০)।

 

রেশমা সিংগাইর উপজে’লার চর আজিমপুর এলাকার আব্বাস আলীর স্ত্রী’। স্বামী আব্বাস আলী একজন ব্যবসয়ী। রেশমা স্বামী ও ১৫ বছরের মে’য়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মীম এবং ৩ বছরের ছে’লে সন্তান রাইয়ান বিন আয়ানকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন। ২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর সাতাশি বছর বয়সে মস্তিষ্কে র’ক্তক্ষরণজনিত অ’সুস্থতায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতা’লের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে জান ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন। মৃ’ত্যুর পূর্বে হাসপাতা’লে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই নিজের দেহ দান করে যান চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য এবং তার চোখ দুটি দান করে দিয়ে যান সন্ধানীকে।

 

সেসময় টিভিতে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের মৃ’ত্যু ও তার চোখ দুটি সন্ধানীকে দান করে যাওয়ার খবর প্রচার হলে সন্ধানীর সাথে যোগাযোগ করেন ধাম’রাইয়ের রেশমা নাসরীন ও তার পরিবার। রেশমা’র তখন বাম চোখের কর্নিয়ায় সমস্যা ছিলো। পরে ওই মাসেরই ১৪ অক্টোবর সন্ধানী চক্ষু হাসপাতা’লে রেশমা’র বাম চোখে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের দান করা একটি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়। সেদিন রেশমা’র আগে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের আরেকটি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয় ফেনী জে’লার ছাগলনাইয়া উপজে’লার বাংলাবাজার চাঁদগাজী স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ইকবাল কবিরের বাম চোখে।

 

অহঙ্কারমুক্ত লো’ভ লালসাহীন একজন সহ’জ-সরল মানুষ ছিলেন ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন। ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো কাবু করতে পারেনি। তিনি সাধারণভাবে জীবন কাটিয়েছেন। তিনি সবসময় দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভাবতেন। ম’রে গিয়েও তিনি দুজনকে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ করে দিয়ে যান। রেশমা নাসরীন জানান, আমি ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের কর্নিয়া পাওয়ার পরই তার পরিবারের সাথে দেখা করতে চাই। কিন্তু আমি খুঁজে পাইনি। প্রায় আট বছর অ’পেক্ষা করার পর কিছু দিন আগেই আমি ভাষা সৈনিকের পরিবাবের সাথে দেখা করেছি। আমি এখন খুব খুশি।

 

তিনি বলেন, আমি দু’চোখ দিয়েই দেখতে পাই। যদিও আমা’র চশমা লাগে। তারপরও এটা আমা’র পরম সৌভাগ্য যে, আমি শুধু একটি নতুন চোখই পাইনি, আমি একজন ভাষা শহীদের চোখ পেয়েছি। ভাষা মতিন শুধু বায়ান্নর ভাষা আন্দলনের সাহসী সৈনিকই নয়। তিনি ছিলেন এক অন্যরকম মানুষ। লো’ভ লালসা, ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো স্প’র্শ করতে পারেনি। আমি আমা’র দুই সন্তানকেও ভাষা মতিনের আদর্শে গড়ে তুলব ইনশাআল্লাহ। কারণ আজকে আমি পৃথিবীর আলো দেখছি একজন মহান মানুষের কর্ণিয়া দিয়ে।

 

রেশমা’র মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মীম বলেন, ‘আম’রা যখন জানলাম মায়ের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করতে হবে। আম’রা খুবই ভয় পেয়েছিলাম। আমি একা একাই স্কুলে যেতাম। আমা’র বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে সব সময় তার মায়েরা থাকতো আমা’র সাথে আমা’র আম্মু যেতে পারত না স্কুলে। এই বিষয়টা আমা’র খুবই খা’রাপ লাগত।

 

মায়ের চোখ ভাল হয়ে যাওয়ার পর আমি ও আমা’র পরিবার খুবই আনন্দিত। ভাষা শহীদ আব্দুল মতিনের চোখে আমা’র মা নতুন করে আলো দেখতে শুরু করেছে এটা আমা’র কাছে খুব গর্বের। আমা’র মা চায় আমিও যেন ভাষা শহীদ আব্দুল মতিনের মত সৎ ও নিষ্ঠাবান হয়ে দেশের কাজে লাগতে পারি।’


More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
error:
error: