রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১০:৫৪ অপরাহ্ন

সরকারি ফি ছাড়া বাড়তি কোনো টাকা নয়: নজরুল ইসলাম ঋতু

প্রকাশিতঃ সোমবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২২, ৬:১৩ পূর্বাহ্ন

‘আমর’া ইউনিয়নে এসেছি জনগণের কাজ করার জন্য। জনগণের পেছনে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। জনগণের কাজ করব এটাই জানি। কে কী বলল, সেটা দেখার কোনো বি’ষয় নয়।’ নিজের অফিসের কাজ করতে করতে কথাগু’লো বলছিলেন বাংলাদেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ঋতু।

 

তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মাত্র দুই মাস হলো। দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিষদের অবকাঠামো থেকে শুরু করে সেখানকার সেবার ধরন কোনো কিছুই পছন্দ হয়নি তার। পরিষদের যাওয়ার রাস্তায় হাঁটুপানি, পরিষদ চত্বরে গরু-ছাগলের বিচরণ, ভবনের ছাদে ফাটল, বাথরুমের বেহাল, অনেক কক্ষে বৈদ্যুতিক বাল্ব নেই, ভাঙাচোরা চেয়ার-টেলিব দেখে আ’ক্ষেপ করেন তিনি। তাই ইউনিয়ন পরিষদটির অবকাঠামোসহ সবকিছুই নিজের মতো করে সাজাতে চান।

তৃতীয় ধাপে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তৃতীয় লিঙ্গের নজরুল ইসলাম ঋতু। তিনিই দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীকে দ্বিগু’ণ ভোটে হারিয়ে ইতিহাস সৃ’ষ্টি করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। শপথ নিয়ে চেয়ারে বসেছেন। নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদে যাচ্ছেন। গত ৩ জানুয়ারি চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন।

 

কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের ধলা দাদপুর গ্রামের আব্দুল কাদের ও ফাতেমা বেগম দম্পতির সন্তান ঋতু। ছোটবেলায় তার মা মা’রা যান। পাঁচ বছর আগে মা’রা যান তার বাবা। সাত ভাই-বোনের মধ্যে ঋতু তৃতীয়। তার তিন ভাই ঢাকায় থাকেন। বোনেদের বিয়ে হয়ে গেছে। সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চেয়ারম্যান কক্ষে ঢুকে চেয়ারম্যানকে ঘিরে ভিড় করে রেখেছে। চেয়ারম্যান মুখে কথা বলছেন, অন্যদিকে হাতের কাজ চলছে। কাউকে শাসন করছেন, কাউকে ভালোবাসছেন। যে যে সমস্যা নিয়ে আসছেন, সেই সমস্যার সমাধান নিজেই করে দিচ্ছেন।

 

সেবাপ্র’ত্যাশীদের জিজ্ঞেস করলে জানান, দেড় মাস ধরে তাদের নতুন চেয়ারম্যান এভাবে সকাল থেকে ‘বিকেল পর্যন্ত জনগণের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এলাকার জনগণও তার আন্তরিক সেবা পেয়ে খুশি। ইউনিয়নের একতারপুর গ্রাম থেকে আসা মো. আছিয়া খাতুন জানান, এই প্রথম তিনি পরিষদে এসেছেন। তার স্কুল থেকে করোনা টিকা নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করতে বলেছে। সে জন্য ইউনিয়ন পরিষদের জন্মনিবন্ধন কার্ড লাগবে করোনা টিকার নিবন্ধন করার জন্য। পরিষদে আসার পর সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে তার কাজটি করে দিয়েছে। কোনো হয়রান ‘হতে হয়নি এবং সরকারি ফি ছাড়া বাড়তি কোনো টাকাও লাগেনি তার। পরিষদের এমন সেবাই খুশি তিনি।

 

৩ নং ওয়ার্ডের বাসি’ন্দা আশিকুর জামান জানান, তিনি এর আগে তিনজন চেয়ারম্যানকে দেখেছেন। বিগত দিনে সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষ যে সমস্যার সম্মুখীন বা হয়রানি হয়েছে, সেগু’লো আর ‘হতে হচ্ছে না। তৃতীয় লিঙ্গের চেয়ারম্যান হওয়া সত্ত্বেও ইউনিয়নবাসীর উন্নয়নের জন্য সালিস-বিচারসহ পরিষদের সব কাজকর্ম সঠিকভাবে করে যাচ্ছেন। তার কাজের প্রতি সেবাপ্রার্থীরা সবাই খুশি।

 

দাদপুর গ্রামের রহিম উদ্দিন জানান, আগে পরিষদে এলে চেয়ারম্যানরা আজ-কাল বলে ঘোরাতেন। যেকোনো কার্ডের জন্য টাকা লাগত। কিন্তু বর্তমানে এই চেয়ারম্যান বলেছেন কার্ড করতে কোনো টাকা লাগবে না। কাজের জন্য আসবেন, কাজ শেষ করে বাড়ি যাব’েন। দুই মাসে তিনটা কাজের জন্য তিনি পরিষদে এসেছেন। সঠিকভাবে কাজ করতে পরে খুশি তিনি।

 

ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রত্মা বেগম জানান, তৃতীয় লীঙ্গের চেয়ারম্যান মহিলা মেম্বারদের মা বলে ডাকতে বলেছেন। চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি খুবই আন্তরিক। পরিষদের কাজ করার জন্য এমন চেয়ারম্যানই দরকার বলে মনে করেন তিনি। ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানান, এবার দিয়ে ইউপি সদস্য হিসেবে তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এর আগেও দুজন চেয়ারম্যানের সঙ্গে কাজ করেছেন। বর্তমানে তৃতীয় লিঙ্গের চেয়ারম্যান নিয়ে কাজ করতে পরে গর্বিত। পরিষদের সদস্য, সচিব, গ্রাম পুলিশসহ সবাই এখন আনন্দের সঙ্গে কাজ করছেন।

 

ইউনিয়নবাসী কেউ মা’রা গেলে তাদের মিলাদ-মাহফিলের জন্য আর্থিক সহায়তা, কোনো সালিস বিচারে কোনো অ’সহায় মানুষ যদি ঋণী হয়ে টাকা দিতে না পারে, সেখানেও তিনি নিজের অর্থ দিয়ে তাদের বিবাদ মীমাংসা করে দিচ্ছেন। ইউনিয়নবাসী ভালো একজন চেয়ারম্যান পাওয়ায় সদস্য হিসেবে তার আর কোনো চাওয়া নেই বলে জানান তিনি। চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে ঋতু বলেন, ভোটে ইউনিয়নবাসী যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তার প্রতিদান দিতে চাই। ভোটের পর দলমত-নির্বিশেষে মানুষ আমা’র কাছে আসছে। আমিও মানুষের সুখে-দুঃখে থাকার চে’ষ্টা করছি। যে দলেরই কর্মী হোক না কেন, আমর’া সবাই একসঙ্গে কাজ করব। কে কোন দল করে, সেটি আমি দেখতে চাই না। আজীবন জনকল্যাণে কাজ করতে চাই। পরিষদে সরকারি ফি ছাড়া বাড়তি কোনো টাকা নয়।

তিনি আরো বলেন, আমা’র নির্বাচিত এলাকায় দুই দিন আগে বৃ’ষ্টি হওয়ার কারণে ইউনিয়নের যেসব রাস্তাঘাট ছিল, তা চলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাস্তাগু’লো খুবই অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে। এই এলাকার রাস্তাঘাট ভালো না। দ্রুত রাস্তাঘাট উন্নয়নের উদ্যোগ নেব। মানুষের যাতায়াত করতে বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ ছাড়া মসজিদ-মন্দির, স্কুল-কলেজ নির্মাণের পাশাপাশি এই ইউনিয়নের মানুষের সুচিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করব।

 

দেশে তৃতীয় লিঙ্গের কোনো স্বীকৃতি ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিজড়া সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দেওয়ায় তার প্রতি কৃতজ্ঞ আমি। প্রধানমন্ত্রী যদি আমা’র দিকে সুদৃ’ষ্টি দেন, তাহলে আমি ইউনিয়নবাসীর জন্য অনেক কিছু করতে পারব। প্রসঙ্গত, গ্রামের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনার সময় তৃতীয় লিঙ্গের বি’ষয়টি প্রকাশ পায়। এ কারণে সমাজে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয় তাকে। বাধ্য হয়ে ১০ বছর বয়সেই গ্রাম ছাড়তে হয় তাকে। রাজধানীর মিরপুরে তার ভাই বাচ্চু মিয়ার বাড়িতে ওঠেন। পরে কিছুদিন পর সেখান থেকে চলে যেতে হয়। এরপর আশ্রয় নেন সি’দ্ধিরগঞ্জ এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের দলে। তবে এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন তিনি। গরিব ও অ’সহায় মানুষকে নিজের জমানো টাকা থেকে সহযোগিতা করতেন। ১৫ বছর ধরে তিনি এলাকার মানুষের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছেন।


More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
error:
error: