শনিবার, ২০ অগাস্ট ২০২২, ০৯:২২ পূর্বাহ্ন

ডিউটি শেষ হলেও বসের কথা রাখতে গিয়ে আগুনে পুড়ল মুন্নীর স্বপ্ন

প্রকাশিতঃ শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১, ৩:৪৭ অপরাহ্ন

অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মুন্নী। বয়স ১৫ বছর ছুঁ’ইছুঁ’ই। বাবা মসজিদের মুয়াজ্জিন। বেতন পান মাত্র পাঁচ হাজার। তিন বোনের মধ্যে মুন্নী মেজো। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কাজে যোগ দেন হাশেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায়। স্বপ্ন ছিল অভাবের সংসারে বাবাকে একটু সহায়তা করবেন। কিন্তু ভ’য়া’বহ আ’গু’নে নিজে বেঁচে ফিরলেও পুড়ে গেল তার সব স্বপ্ন।মুন্নীর পুরো নাম মরিয়া আক্তার। লেখাপড়া করেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা মজিবুর রহমান ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। তার বাবা নাগেরবাগ মসজিদের মুয়াজ্জিন।

 

ঘটনার দিন ছয়তলা ভবনের দোতলায় টোস্টার সেকশনে কাজ করছিলেন মু্ন্নী। বিকেল ৫টায় ডিউটি শেষ হলেও ঈদ সামনে রেখে ল’ক্ষ্য নিয়ে আরো কাজ করতে বলেন সেকশন ইনচার্জ। এরপর ফের শুরু করেন মালামাল প্যাকেটিং। সোয়া ৫টার দিকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবাইকে চারদিকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখেন। আতঙ্কে কেউ শুয়ে যাচ্ছেন মেঝে’তে আবার কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন স্তূ’প করা মালামালের পেছনে। টোস্টার সেকশনে কাজ করা প্রায় ৬০ জন শ্রমিকের বড় একটি অংশ সিঁ’ড়ি বেয়ে নিচে নামতে যান। কিন্তু ধোঁ’য়া দেখে ফিরে আসেন দোতলায়।

 

ধীরে ধীরে ধোঁয়ায় অন্ধ’কারা’চ্ছন্ন হতে থাকে পুরো দোতলা। বন্ধ হয়ে যায় লাইট-ফ্যান। মেশিনগুলোও ব’ন্ধ হয়ে যায়। শুধু শোনা যাচ্ছিল মানুষের আর্তনাদ। শত মানুষের আ’র্তনা’দে ভে’ঙে পড়েন মুন্নী। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে একটি টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন। তাপদাহ আর ধোঁ’য়াচ্ছ’ন্ন দমবন্ধ পরিবেশে তখন শোনা যাচ্ছিল ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার। ‘মাগো, বাবাগো’ বলে কান্না করছিলেন সবাই।

 

আ’গুনের লে’লিহা’ন শিখা যেন নিচ থেকে সিঁড়ি দিয়ে উঁকি মে’রে বারবার দেখিয়ে যাচ্ছিল ভ’য়ং’কর রূপ। সন্ধ্যা তখন সোয়া ৭টা। অ্যাম্বুলেন্স আর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সাইরেন। সে শব্দ ছাপি’য়েও আসছিল বাইরের লোকের চিৎকার- চেঁচামেচির শব্দ। এক সময় দোতলার কিছু সাহসী যুবক দক্ষিণ দিকের শা’টার ভা’ঙতে শুরু করেন। একপর্যায়ে শা’টারটি ভে’ঙে যায়। এরপর লোকজন লা’ফিয়ে লা’ফিয়ে নিচে পড়তে থাকেন।

 

মুন্নীও তখন টেবিলের নিচ থেকে বের হয়ে ভা’ঙা শাটারের কাছে গিয়ে দেখেন ফায়ার সার্ভিসের অধিক উচ্চতার মইটি। এরপর লা’ফিয়ে পড়েন সেখানে। এতে গু’রুত’র জ’খম হলেও প্রাণে বেঁচে যান মুন্নী। এছাড়া মইটিতে পাঁচ বা ছয়তলা থেকে এক যুবক লাফ দেন। কিন্তু ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এভাবেই সেই ভ’য়াব’হ সন্ধ্যার বর্ণনা দিয়েছেন রূপগঞ্জের হাশেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় লাগা আ’গুনে বেঁ’চে ফেরা শ্রমিক মারিয়া আক্তার মুন্নী। বর্ণনা দিতে গিয়ে তার শরীরে কাঁ’পুনি ওঠে।

 

মুন্নীকে প্রথমে অ্যাম্বুলে’ন্সে স্থানীয় ইউএস বাংলা মেডিকেলে নেয়া হয়। সেখানে চোখের চিকিৎসা দিতে না পারায় তাকে বাসায় নেন স্বজনরা। বাসাতেই তার চিকিৎ’সা চলছে। তবে গতকাল থেকে চোখে ঝাপ’সা দেখছেন মুন্নী। তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসক। এ কারণে আহতের তালিকায় নাম লেখাতে ছুটে এসেছেন ধ্বং’সস্তূ’প কার’খানার গেটে। কিন্তু অনেকের হাতে-পায়ে ধরেও কোনো কাজ হয়নি। মেয়েটি যে কারখানার শ্রমিক তা প্রমাণের পরিচয়পত্রটিও রয়ে গেছে সেই দো’তলায়। পরে কারো দেখা না পেয়ে কান্না করতে করতে চলে যান মুন্নী ও তার স্বজনরা।


More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
error:
error: